সর্বশেষ সংবাদ :

‘সৌদি সরকারের প্রতিক্রিয়ায় রাজপরিবারের দোষী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়’

অনন্য! অবিশ্বাস্য! জঘন্য! নাটকীয়! হৃদয়বিদারক! বর্বরোচিত! অকল্পনীয়! জটিল! অনুভূতিহীন! শয়তানের কাজ! স্বেচ্ছা নির্বাসিত ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে যে কারো মনেই উপরোক্ত অভিধাগুলো ছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরো অনেক কিছু আসবে কিন্তু তা স্বত্বেও শব্দের গাঁথুনি শেষ হবে না।

এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সৌদি আরবের অস্বীকার করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে স্বীকার করা পর্যন্ত সকল বিষয় খাসোগি হত্যাকাণ্ডের নাটকীয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে।

খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি সরকারের যে সব প্রতিক্রিয়া আমরা জেনেছি তাতে করে সৌদি রাজপরিবারের নেতৃত্বের অযোগ্যতা এবং দোষী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। খাসোগি সৌদি স্বৈরশাসকদের অন্যতম সমালোচক ছিল যিনি অত্যাচারের ভয়ে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হয়েছিলেন।

WASHINGTON, DC – OCTOBER 19: A protester dressed as Saudi Arabian crown prince Mohammad bin Salman and another dressed as U.S. President Donald Trump, demonstrate with members of the group Code Pink outside the White House in the wake of the disappearance of Saudi Arabian journalist Jamal Khashoggi October 19, 2018 in Washington, DC. Khashoggi has disappeared following a meeting at the Saudi consulate in Istanbul on October 2, 2018. (Photo by Win McNamee/Getty Images)


একই সাথে সৌদি রাজপরিবারের গুণগ্রাহী সাংবাদিকদের জন্য এধরনের প্রচণ্ড শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কখনো নেয়া হয় না, এমনকি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের নিকটে ও সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ড একটি জঘন্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

বিশ্বব্যাপী কর্মরত হাজার হাজার সাংবাদিকের জন্য খাসোগি হত্যাকাণ্ড একটি অশনি সংকেতের মত যারা প্রতিনিয়ত অনেক হুমকি উপেক্ষা করে বহু ঝুঁকির মধ্যে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো খাসোগি হত্যাকাণ্ডের দাবার গুটি ধরতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু এ ঘটনাটিকে ধর্মীয় এবং ইসলামিক দিক থেকে বিবেচনা করা যাক। ইসলামী মূল সূত্র হচ্ছে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়া এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি সতর্ক বার্তা দেয়া প্রয়োজন যে, আমি কোনো ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ নই। আমি পবিত্র কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ(সাঃ) এর হাদিসের উপর ভিত্তি করে আমার অনুচ্ছেদটি লিখেছি।

প্রাথমিকভাবে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সাথে ধর্ম এবং ধর্মীয়-ভিত্তিক নেতাদের কোনো সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে না। কোনো তর্ক ছাড়াই সৌদি আরব ইসলামিক বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্র। এই দেশটি ইসলামিক বিশ্বের ধর্মীয় রাজধানী।

যেহেতু সৌদি রাজ-পরিবার দেশটির কেন্দ্রে অবস্থান করছে সেহেতু বিশ্বের মুসলিমগণ এই শাসন ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা।

তবে এখানে অনেকগুলো প্রশ্নের উদয় হয়। খাসোগি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সৌদি রাজপরিবার বিশ্বের মুসলিমদের নিকটে কি বার্তা পৌঁছাতে চাচ্ছে? তারা কি এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, যে কেউই তাদের মত ঠিক এরকম ব্যবহার করতে পারে?

তারা কি এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, ইসলাম কোন সঠিক পন্থা এবং উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই হত্যাকাণ্ডকে বৈধ করেছে? তারা কি এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, হত্যাকাণ্ডের পরে মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে ফেলা বৈধ কাজ? তারা কি এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, মৃত দেহকে কবর দেয়া অতোটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ নয়?

সত্যিকার অর্থে ইসলাম কোনোভাবেই কারণ ছাড়া হত্যাকাণ্ড এবং রক্তপাত ঘটানোকে সমর্থন করে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায় যে, সৌদি রাজত্বের মতে খাসোগি যে অপরাধ করেছে তা কি সৌদির শরিয়া আইন দ্বারা বিচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং খাসোগির অপরাধ কি প্রমাণিত হয়েছে?

ইসলামি আইনে যে কোনো হত্যাকাণ্ডকেই সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা আল নিসায় বলা হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’-(আল-কুরআন; সূরা- ৪ আয়াত- ৯৩)।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়েদায় বলা হয়েছে- ‘এ কারণেই আমি বনী-ইসরালাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।’ -(আল কুরআন; সূরা-৫, আয়াত-৩২)

তাহলে সৌদি রাজপরিবার পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এসব আইন সমূহে সম্পর্কে কী ভেবে নিয়েছেন? তারা কি এসব আয়াত এড়িয়ে গিয়েছেন? তারা কি মনে করেছেন যে, এসব আয়াত অপ্রয়োজনীয়?

হত্যাকাণ্ডের মতই ইসলাম যে কোনো ধরনের মিথ্যা কথা বলা সমর্থন করে না। পবিত্র কুরআনে মিথ্যা, মিথ্যা বলা এবং মিথ্যুকদের সম্পর্কে বেশ কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল যুমারে বলা হয়েছে- ‘জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন না।’ –(আল-কুরআন; সূরা- ৩৯; আয়াত- ৩)।

পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরে বলা হয়েছে- ‘এবং স্ত্রীর শাস্তি রহিত হয়ে যাবে যদি সে আল্লাহর কসম খেয়ে চার বার সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’ –(আল-কুরআন; সূরা- ২৪; আয়াত- ৮)।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা যখন বললে, হে মূসা, আমরা একই ধরনের খাদ্য-দ্রব্যে কখনও ধৈর্যধারণ করব না। কাজেই তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট আমাদের পক্ষে প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের জন্যে এমন বস্তু-সামগ্রী দান করেন যা জমিতে উৎপন্ন হয়, তরকারি, কাকড়ী, গম, মসুরি, পেঁয়াজ প্রভৃতি। মূসা (আঃ) বললেন, তোমরা কি এমন বস্তু নিতে চাও যা নিকৃষ্ট সে বস্তুর পরিবর্তে যা উত্তম? তোমরা কোন নগরীতে উপনীত হও, তাহলেই পাবে যা তোমরা কামনা করছ। আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হলো এ জন্য যে, তারা আল্লাহর বিধি বিধান মানত না এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান সীমালংঘন কারী।’- (আল-কুরআন; সূরা-৩; আয়াত- ৬১)।

এমনকি নবী মুহাম্মদ(সাঃ) তার সারাজীবন মিথ্যাবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা কথা অবশ্যই একটি শয়তানের কাজ এবং একটি জঘন্য পাপ কাজ।’

অপর এক হাদিসে মুহাম্মদ(সাঃ) বলেন, ‘তোমাদেরকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে, কারণ সত্যবাদিতা সঠিক দিকের দিকে তোমাকে ধাবিত করবে আর সঠিক দিক তোমাকে জান্নাতের দিকে ধাবিত করবে।’

মুহাম্মদ (সাঃ) এর অপর এক হাদিস থেকে জানা যায় যে, তিনি বলেছেন- ‘যে কেউ কোনো উপযুক্ত কারণ ছাড়াই মিথ্যা কথা বলবে তার প্রতি সত্তর হাজার ফেরেশতার অভিশাপ পড়তে থাকবে।’

সুতরাং সৌদি কনস্যুলেটে খাসোগির প্রবেশের পরে তাকে কোনো কারণ ছাড়াই হত্যা করা এবং পরবর্তীতে তার মৃত দেহকে টুকরো টুকরো করে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

খাসোগির হত্যাকাণ্ডের পরে যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রথমে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে কিন্তু পরবর্তীতে তারা তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

তবে সাংবাদিক খাসোগিকে হত্যা করা হয়েছে সৌদি সরকারের অগোচরে এরকম ব্যাখ্যা এই শতাব্দীর সবচেয়ে জঘন্য একটি মিথ্যা। এমনকি যে করাতের মাধ্যমে খাসোগির দেহকে টুকরো টুকরো করা হয়েছে তা উন্মুক্ত হওয়াতে সৌদি সরকারের মিথ্যার মুখোশ খুলে গিয়েছে।

বর্তমানে মানুষ আগ্রহের সহকারে জানতে চায়- খাসোগির দেহাবশেষ কোথায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছ। সৌদি সরকার থেকে জানানো হয়েছে যে, খাসোগির মৃত দেহটি ইস্তাম্বুলের স্থানীয় এক সহযোগীকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সৌদি সরকারের এধরনের বিবৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, তারা এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য দিতে নারাজ। মৃতদেহকে কোনো ধরনের দাফন কাফন ছাড়াই ফেলে দেয়ার বিষয়ে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মৃতদেহকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গোসল করিয়ে এবং জানাযার ব্যবস্থা করে সঠিকভাবে দাফন করার জন্য ইসলামে নির্দেশিত হয়েছে।

তবে সৌদি রাজত্বের বর্তমান অবস্থান এটিই প্রমাণ করে যে, তারা ইসলামের এসকল নিয়ম কানুনগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে এগিয়ে যেতে চায়।

খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পরে এখন এই শঙ্কা তৈরী হয়েছে যে, সৌদি কারাগারে আটক ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিকদের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছে বা কী ঘটতে চলেছে। কারাগারে আটক এসকল সাংবাদিকরা কোথায় রয়েছেন সৌদি সরকারকে এখন এমন প্রশ্নের মুখোমুখি করা উচিত।

খাসোগি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে যেভাবে বিশ্ববাসী উঠে পড়ে লেগেছে বিশেষত এ ব্যাপারে তুর্কি সরকারের পদক্ষেপসমূহ প্রশংসার দাবী রাখে ঠিক একইভাবেই এ মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বকে আরো বেশী ইসলামি নিয়ম কানুনগুলো সঠিকভাবে আদায় করা দরকার।

এখন এটি পরিষ্কার যে, খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মূল কর্তা ব্যক্তিগণ এই পৃথিবীতে কখনো শাস্তির মুখোমুখি হবে না। তথাপি মহান আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে উত্তম বিচারক যিনি সব কিছুই দেখেন।

খাসোগি হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার হতে হয়তো কিছু দেরি হবে তবে চূড়ান্তভাবে তিনি ন্যায় বিচার পাবেন। আমরা খাসোগির আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তায়ালা যাতে খাসোগির পরিবারের সকল সদস্যদের এই শোক কাটিয়ে উঠতে শক্তি দান করেন। বিশেষত খাসোগির বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিসকে আল্লাহ তায়ালা শক্তি দান করুন।

শেষে খাসোগির উদ্দেশ্যে তার বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিসের একটি বার্তা দিতে চাই- ‘তারা আমার বিশ্ব থেকে তোমাকে শারীরিকভাবে উদাও করে দিয়েছে। কিন্তু তোমার সুন্দর হাসি আমার হৃদয়ে সবসময়ের জন্য গেঁথে আছে আমার প্রিয়!’

সূত্রঃ ঘানার কলাম লেখক ইদ্রিস মুসা এর কলাম থেকে। মাই জয় অনলাইন ডট কম।

log

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

shared on wplocker.com