সর্বশেষ সংবাদ :

জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টা

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়েছে। তাঁর মাথায় ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। হাত ও পিঠেও রয়েছে ছুরির জখম। গতকাল বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে প্রকাশ্যে জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় এক যুবক। আহত অবস্থায় তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর মাথায় সিটি স্ক্যান ও অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি শঙ্কামুক্ত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জাফর ইকবালকে গত রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় এনে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার পরপরই হামলাকারী যুবককে আটক করা হয়েছে। জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শাবি ক্যাম্পাস। দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ এলাকায় ইইই বিভাগের ফেস্টিভ্যাল চলছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল। তিনি যখন অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসা ছিলেন, তখন ঠিক পেছনে থাকা এক যুবক ছুরি নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। শাবির প্রক্টর জহির উদ্দিন জানান, মঞ্চের পেছন দিকে থাকা এক যুবক ছুরি নিয়ে হামলা চালায়। এতে মাথায় ও ঘাড়ে ছুরিকাহত হন জাফর ইকবাল। ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার পরপরই তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা হামলাকারী যুবককে আটক করেন। ওই সময় হামলাকারী যুবকের ছুরিকাঘাতে ইবরাহিম নামে এক পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। হামলাকারী যুবককে গণপিটুনি দেন শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশ হামলাকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-২-এ নিয়ে আটকে রাখে। আহত হওয়ার পরপরই জাফর ইকবালকে সিলেট এম এ জি ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাশেদুন্নবীর অধীনে চিকিৎসা চলে তাঁর। মাথায় সেলাই দেওয়ার পর সিটি স্ক্যান করা হয়। পরে মাথায় অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসকরা। জাফর ইকবালকে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁকে কথা বলতে দেখা গেছে। চিকিৎসকরা জানান, তিনি শঙ্কামুক্ত। ওসমানী হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. মুর্শেদ আহমদ চৌধুরী জানান, জাফর ইকবালের মাথায় আঘাতের ক্ষত বেশি গভীর নয়। তিনি শঙ্কামুক্ত। জাফর ইকবালের ওপর হামলার খবর পেয়ে শাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এসে ভিড় করেন হাসপাতালে। সিলেটের রাজনীতিবিদ, সুধীসমাজের প্রতিনিধিরাও আসেন। তাঁরা তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ডা. নাজমানারা খানুম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোনে কথা বলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী জাফর ইকবালের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে তাঁকে দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে নিয়ে ঢাকায় রওনা দেয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। পরে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর পুরাতন এয়ারপোর্টে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি অবতরণ করার পর সেখান থেকে জাফর ইকবালকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল হক জানান, জাফর ইকবালের শরীরে চারটি আঘাত রয়েছে। তিনটি মাথার পেছনে, একটি পিঠের বাঁ পাশে। আঘাতের স্থানে সেলাই দেওয়া হয়েছে। তিনি শঙ্কামুক্ত। তবু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

জাফর ইকবাল হামলার শিকার হওয়ার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শাবি ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠেন বিক্ষুব্ধ। তারা দফায় দফায় বিক্ষোভ করতে থাকেন ক্যাম্পাসে। একপর্যায়ে যেখানে হামলাকারীকে আটকে রাখে পুলিশ, সেই একাডেমিক ভবন-২ ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের ঘেরাওয়ের কারণে হামলাকারী যুবককে বের করতে হিমশিম খান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পরে রাত ৯টার দিকে র‌্যাব ও পুলিশ প্রহরায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

হামলাকারী যুবকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গতকাল রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব। তিনি বলেন, ‘জাফর ইকবালের সঙ্গে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ছিল। পুলিশ সদস্যরা ছিলেন। তবে হামলাকারী হয়তো তাত্ক্ষণিক সুযোগ নিয়েছেন।’ আবদুল ওয়াহাব আরও বলেন, ‘হামলাকারীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে তার পরিচয় জানা যায়নি এখনো। তার অবস্থাও তেমন ভালো নয়।’ এর আগে এই পুলিশ কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, জাফর ইকবালের ওপর যে যুবক হামলা চালিয়েছে, তার হামলায় এক পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থলে আসে। এর মধ্যে একজন জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাত করে, অন্যজন মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে হামলার সঙ্গে দুজন জড়িত কিনা— এ প্রশ্নের জবাবে আবদুল ওয়াহাব বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।’

ওসমানী হাসপাতালে জাফর ইকবালকে দেখতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘এ হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যে বা যারা এ হামলার পেছনে জড়িত, তাদের গ্রেফতারে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কাজ শুরু করে দিয়েছে।’

হামলার প্রতিবাদে সিলেটে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রলীগ ও গণজাগরণ মঞ্চ। গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।

log

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

shared on wplocker.com