সর্বশেষ সংবাদ :

নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন মুমিনুল হক

মুমিনুল এখনও শর্ট বল কিংবা অফ স্পিনে দুর্বল কত কথা বলেছিলেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে।এখন সব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুমিনুল হক। না মুখের কথায় নয়, ব্যাটের আঁচড়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে দিয়ে সকল প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন বাংলার ব্র্যাডম্যান খ্যাত ছোট গড়নের এই মানুষটি।

হাথুরুসিংহের শিষ্যরা কিন্তু শর্ট বল করেও মুমিনুলকে থামাতে পারেননি। প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরি করে তিনি এখন ইতিহাসের পাতায়। সাবেক কোচকে মোক্ষম জবাব দিয়েও মুমিনুল সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন ভদ্রতার চাদরে আবৃত নির্বিকার শিষ্য।

এদিকে ক্রিকেট ইতিহাসে সব দেশের থাকলেও কেবল বাংলাদেশের এক টেস্টের দুই ইনিংসেই কোনো ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল না। মুমিনুল হক অসম্ভব প্রয়োজনের সময় অভিজাত সেই তালিকায় দেশ ও নিজের নাম লিখে দিলেন।যা মানুষ মনে রাখবে সারাজীবন।প্রথম ইনিংসে ৫০০ বা তার বেশি রান করে দু’বার টেস্ট হারার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। শনিবার যখন শ্রীলঙ্কার চেয়ে ১১৯ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেটে ৮১ রান নিয়ে দিনের খেলা শেষ করে তারা, ইতিহাস পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছিল অনেকের মনেই। তবে ক্রিজে যে ছিলেন মুমিনুল! রবিবার তিনি দেশকে হারতে না দেয়ার পণ নিয়েই নেমেছেন ব্যাটিংয়ে। প্রথমেই ভেঙেছেন এক টেস্টে কোন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। এরপর লিখেছেন সেঞ্চুরির রেকর্ড। প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রানের ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও সেঞ্চুরি। আর দলকেও দেখিয়ে দেন ড্রয়ের পথ। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ৭১ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ২৩৮ রান। ৩৮ রানের লিড বাংলাদেশের।

লঙ্কান চায়নাম্যান বোলার লাকশান সান্দাকানের করা ৭১তম ওভারের তৃতীয় বলে সিঙ্গেল নিয়ে মুমিনুলকে স্ট্রাইকিং প্রান্তে দেন লিটন দাস। বাংলার ব্র্যাডম্যান তখন ব্যাট করছেন ৯৯ রানে। তার একটি রানের দিকে চেয়ে আছে দেশের সকল ক্রিকেটপ্রেমী। পরের বলে কোন রান নিলেন না মুমিনুল। ওভারের পঞ্চম বলটি কাভার পয়েন্টে ঠেলে দিয়ে এক রান পূর্ণ করে ছুঁলেন নিজের ষষ্ঠ সেঞ্চুরির ইনিংস। সাথে সাথে বাধা পড়লেন সতীর্থ লিটনের আলিঙ্গনে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে যে ক্রিকেটের এই শিল্পী করেছেন টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে দলের ভীষণ প্রয়োজনের সময় ১৫৪ বলে এই শতক হাঁকিয়েছেন মুমিনুল।

বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত ৮৭ জন ক্রিকেটার টেস্ট খেলেছেন। তাদের মাঝে ২৬ বছর বয়সী মুমিনুলই নিজের ২৬তম টেস্টে এসে গড়েছেন দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করার সম্মানের রেকর্ড।

বিশ্বের ১০ টেস্ট খেলুড়ে দলের (আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড বাদে) এখন পর্যন্ত ৮২ জন খেলোয়াড় এক টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড করেছেন। মুমিনুল এই তালিকায় ৮৩তম ও প্রথম বাংলাদেশি।

মুমিনুল তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ছয় সেঞ্চুরির পাঁচটিই করেছেন চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। এই মাঠে তার রান ৫০ পার হলেই সেটি রূপান্তরিত হয়েছে সেঞ্চুরিতে। একটি কাকতালীয় ব্যাপারও ঘটেছে রবিবার। চার বছর আগে ঠিক আজকের তারিখেই শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছিলেন। তার ইনিংস দুটি ছিল যথাক্রমে ৩১৯ ও ১০৫ রানের। চার বছর পর শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতা দিবসে মুমিনুল লঙ্কানদের বিপক্ষে গড়েছেন এই কীর্তি।

এর আগে হাথুরুসিংহে প্রায় সাড়ে তিন বছর কোচ ছিলেন বাংলাদেশের। এই সময়ে ভালোই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল মুমিনুলকে। গত বছর অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দল থেকে বাদও পড়েছিলেন তিনি। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক হৈচৈয়ের পর তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। হাথুরুসিংহে বাংলাদেশ ছেড়ে শ্রীলঙ্কা দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রামে প্রথম মুখোমুখি হলেন ‘পকেট ডায়নামো’। আর শুরুতেই বাজিমাত। ১৭৬ আর ১০৫ রানের দুটো দুর্দান্ত ইনিংসের সৌজন্যে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে মুমিনুল বললেন, ‘আমার জীবনে ওই গ্যাপ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আপনাদের ভাবনা জানি না, তবে আমার মনে হয় এটা আমার জীবনে অনেক প্রভাব ফেলেছে। ওই সময়ে আমার মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।’

১৭৬ রানের ইনিংসের প্রতিটি পরতে ছিল অভিমান। সেঞ্চুরির পর মুমিনুলের বাতাসে ভাসানো ঘুষিতেই তার আভাস। চট্টগ্রাম টেস্ট থেকে তার অনেক প্রাপ্তি। বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুততম দুই হাজার রান আর দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরির (৯৬ বলে) পাশাপাশি জোড়া সেঞ্চুরির কীর্তি তো আছেই। অথচ হাথুরুসিংহের ‘আমলে’ কী কঠিন সময়ই না পার করেছিলেন তিনি! শ্রীলঙ্কান কোচ বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তার গড় ছিল ৭৫-এর ওপরে। তবে গত তিন বছরে তা নেমে আসে ৪৩.৮০-এ। এই সময়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র একটি সেঞ্চুরি।

হাথুরুসিংহের বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নে মুমিনুল বিনয়ের সাথে বলেন, ‘এমন কথা মনেই আনছি না। কোনও খেলোয়াড়ের পক্ষে আগে পরিকল্পনা করে কিছু করা সম্ভব নয়। আসলে মানসিকভাবে আমি আগের চেয়ে অনেক শক্ত।’সাবেক কোচকে জবাব দেওয়ার প্রশ্ন শুনে হাসলেন মুমিনুল, ‘জবাব দেওয়ার কিছু নেই। আসলে আপনার প্রশ্নের উত্তরই আমার কাছে নেই।’ নিজেই জানালেন, চট্টগ্রামে প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তার কাছে বেশি দামি, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে রান করা দরকার ছিল। আমি তাই দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরিটা এগিয়ে রাখবো। কারণ ওটা ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস ছিল।’

Source: rtnn

log

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

shared on wplocker.com